আধুনিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস-আনাস ফয়সাল- এসএসসি ব্যাচ ২০২৩

প্রবন্ধ

বর্তমান এই আমেরিকার ইতিহাস বেশ পুুরনো। আমেরিকার এই অঞ্চলে স্পেনীয় ও ইউরোপীয়রা উপনিবেশ স্থাপন কর, ফিরে যাওয়া যাক সেই ইতিহাসে। ১৪৯২ সাল। ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপন শুরু হতে যাচ্ছে পুনরায়। সে বছর একটি স্পেনীয় অভিযাত্রীদল ইউরোপ থেকে পশ্চিম অভিমুখে নৌযাত্রা শুরু করে, এ নৌযাত্রার উদ্দেশ্য ছিল দূরপ্রাচ্যে যাওয়ার একটি বাণিজ্যিক নৌপথ আবিষ্কার করা। এই যাত্রীদলের নেতৃত্বে ছিল জেনোয়ার অভিযাত্রী নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস, নৌযাত্রার এই নাবিক এই ইতিহাসের অন্যতম এক চরিত্র, তাই তার পরিচয়টা ও বেশ গুরত্বপূর্ণ। ক্রিস্টোফার কলম্বাস ইতালির জেনোয়া শহরে জন্ম নেওয়া এক নাবিক ও ঔপনিবেশিক, তবে কেন তিনি এই ইতিহাসের অন্যতম চরিত্র তা আমরা জানবো বিস্তারিত ইতিহাসের মাঝে। যদি ও এই যাত্রীদলের যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্যিক যাত্রাপথ আবিষ্কার তবে এর পরিবর্তে তারা আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করে ফেলে। ইউরোপীয়রা আবিষ্কৃত এই ভূখণ্ডের নাম দেয় “নতুন বিশ্ব”। ১৪৯২ সালের ৫ই ডিসেম্বর। কলম্বাস হিস্পানিওলা দ্বীপের উত্তরাংশে নোঙর ফেলেন। নোঙর বলতে বিশেষ এক ধাতব যন্ত্রকে বোঝানো হয়, যার লম্বা ধাতব অংশের সাথে অনেকগুলো বর্শার ফলরার মতো অংশ থাকে। হিস্পানিওলা দ্বীপ বর্তমান ক্যারিবিয়দের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ এক দ্বীপ। হিস্পানিওলা দ্বীপে তাইনো জাতির লোকের বসবাস ছিল প্রায় সপ্তম শতাব্দী থেকেই। কলম্বাস এই দ্বীপে আক্রমণে শতভাগ সফলতা লাভ করে এবং এটিই ছিল নর্সদের পর আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয়দের প্রথম বসতি স্থাপনের দৃষ্টান্ত। এর পরেই ইউরোপীয়রা বর্তমান আমেরিকা মহাদেশের ভূমিদখল, ও বৃহত্তর আকারের অভিযান শুরু করে। শুরু করে সেসব স্থানে তাদের বসতি স্থাপন । কলম্বাস তার প্রথম দুই যাত্রাতেই বেশ সফলতা অর্জন করে এবং দখল করে নেয় বাহামা সহ বেশকিছু ক্যারিবীয় দ্বীপ। হিস্পানিওলা, পুয়ের্তো রিকো এবং কুবা বা কিউবাতে তার অধীনে চলে যায়। ১৪৯৮ সাল। ইংরেজ রাজা হেনরির প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে তার নাবিক জন ক্যাবট ব্রিস্টল বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের উপকূলে অবতরণ করেন। এর এক বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৪৯৯ সালেই কলম্বাস তার তৃতীয় যাত্রায় দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের পৌঁছায়। কলম্বাসের এই অভিযান সফলতার গন্ডি পেরিয়ে যায়, যখন অর্থবিনিয়োগকারী ইউরোপীয় শক্তি হিসেবে স্পেন উত্তর আমেরিকা থেকে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ হয়ে দক্ষিণ আমেরিকার একেবারে দক্ষিণতম প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সুবিশাল এক ভূখণ্ড স্পেনীয় সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসে। শুধু স্পেন নয় আমেরিকার এঔ উপনিবেশ স্থাপনে ভূমিলা ছিল আরও ইউরোপীয় জাতির। ফরাসিরা তাদের প্রথম ফরাসি সাম্রাজ্য পর্বে আমেরিকা মহাদেশে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করে। তারা উত্তর আমেরিকার পূর্বভাগের বেশ কিছু ক্যারিবীয় দ্বীপ নিজেদের অধীনত্বের অন্তর্ভুক্ত করে। এছাড়া ও দক্ষিণ আমেরিকার ক্ষুদ্র কিছু উপকূলীয় অঞ্চলে ও তাদের উপনিবেশ নির্মাণ করেছিল। আবার অন্যদিকে, পর্তুগাল বর্তমান ব্রাজিল অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করে। শুধু তাই না, তারা বর্তমান কানাডার পূর্বভাগের বেশ কিছু অংশ জুড়ে তাদের উপনিবেশ গড়ার চেষ্টা করে, যদি ও এতে তারা তেমন সফলতা অর্জন করে না। তারা বেশ দীর্ঘ সময় ধরে রিও দে লা প্লাতা নদীর উত্তর-পশ্চিম দিকে নদীর পূর্ব উপকূলে বসতি স্থাপন করেছিল। শেষ পর্যন্ত পশ্চিম গোলার্ধের বেশিরভাগ এলাকা চলে আসে ইউরোপীয়দের অধীনে। উনওশ শতাব্দীতে প্রায় ৫ কোটিরও বেশি ইউরোপীয় আমেরিকা মহাদেশগুলির অভিবাসন করে। ১৪৯২ সালের পরের পর্বটি কলম্বীয় হস্তান্তর নামে পরিচিত। এসময় আমেরিকা মহাদেশগুলিতে নাটকীয়ভাবে প্রাণী, উদ্ভিদ, সংস্কৃতি, জনগণের প্রকৃতি বিশাল এক পরিবর্তন হয়ে যায়।
আমেরিকান গৃহযুদ্ধঃ
বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এক যুদ্ধ ‘আমেরিকান সিভিল ওয়ার’- ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের হওয়া এই গৃহযুদ্ধের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হলেও এর সম্পর্কে জানে না অনেকেই।এই যুদ্ধের কারণেই আমেরিকা মুক্ত হয়েছিলো দাসপ্রথার মতো বিষবাষ্প থেকে। এই ঐতিহাসিক গৃহযুদ্ধ নিয়ে লিখেছে আমাদের “ Content Writing Team” এর সদস্য আনাস ফয়সাল। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ প্রেক্ষাপট ইউরোপীয়ানরা আমেরিকা দখল করার পর তাদের আফ্রিকার কলোনীগুলো থেকে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের আনতে থাকে যাতে তাদের দিয়ে আমেরিকার মাটিতে চাষসহ বিভিন্ন কাজ করাতে পারে৷ এই কৃষ্ণাঙ্গ মানুষগুলোকে দাস হিসেবে খাটানো হতো পশুর মতো, তাদের উপর চলতো নির্মম অত্যাচার।বর্তমান আফ্রিকান-আমেরিকানরা এই দাসদেরই বংশধর। ১৯ শতকের শুরু থেকে এই দাসপ্রথা বিলুপ্তি নিয়ে মানুষ সচেতন হতে থাকে। এ বিষয়ে যদিও উত্তরের রাজ্য(স্টেট) গুলো অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলো,দক্ষিণে তখনো দাসপ্রথা চলতে থাকে। সেসময়ে উত্তরের প্রদেশগুলো ছিলো শিল্পনির্ভর যাতে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছিলো। অন্যদিকে দক্ষিণের প্রদেশগুলো তখনো কৃষির উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে তুলা ও তামাক চাষ। আর এই কৃষিকাজে ব্যবহার করা হতো দাসদের। তাই তাদের অর্থনীতির একটি বড় অংশ ছিলো দাসদের অবদান৷ এরমধ্যেই বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে ১৮৫৪ সালে আমেরিকায় দাসপ্রথার বিস্তার বিরোধী দল হিসেবে গঠিত হয় রিপাবলিকান পার্টি। ১৮৬০ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে এই রিপাব্লিকান পার্টি থেকে প্রার্থী হন আব্রাহাম লিংকন। লিংকন ক্ষমতায় আসলে দাসপ্রথা বিলুপ্তির ঘোষণা দেন। আর এতেই দক্ষিণের দাস ব্যবসায়ী শ্বেতাঙ্গদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। তারা ভাবলো দাস না থাকলে দক্ষিণের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। আর তাদের অর্থনীতি ধ্বংসেরই পায়তারা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। জেনে রাখা ভালো আব্রাহাম লিংকন এর এই রিপাব্লিকান পার্টিই হলো সে দল আজ যে দলের প্রতিনিধিত্ব করছে ট্রাম্প এর মতো বর্ণবাদী নেতা৷ কিভাবে আব্রাহাম লিংকন এর দাসপ্রথা বিরোধী রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধিত্ব ট্রাম্পের মতো বর্ণবাদী নেতাদের দলে পরিণত হলো সে গল্প অন্যদিনের৷ এখন ফিরে আসি ১৮৬০ এর নির্বাচনে। কনফেডারেটস স্টেটস অফ আমেরিকা বা কনফেডারেসি গঠন সেই নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি বিজয়ী হলেও ১৮৬১ সালের ৪ঠা মার্চ লিন্কন তার দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেই ৮ই ফেব্রুয়ারি সাতটি দাসরাজ্য মিলে (সাউথ ক্যারোলিনা, মিসিসিপি, ফ্লোরিডা, অ্যালাবামা, জর্জিয়া, লুইজিয়ানা ও টেক্সাস) ইউনিয়নের বিরুদ্ধে চলে যায়। পরবর্তীতে এতে যোগ দেয় আরো ৪ টি রাজ্য ( ভার্জিনিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা, আরকানসাস, টেনেসী)। রাষ্ট্রপতি জেফারসন ডেভিস এর নেতৃত্বে এই ১১ টি প্রদেশ নিজেদেরকে মূল যুক্তরাষ্ট্র হতে আলাদা ঘোষণা করেছিল এবং নামকরণ করেছিল কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকা বা কনফেডারেসি। তবে বিদায়ী ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট জেমস বুকানন এবং সেইসময়কার ক্ষমতাসীন দল রিপাব্লিকানরা এই বর্জনকে বেআইনি বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তারপর ও আব্রাহাম লিঙ্কন তার উদ্বোধনী বক্তব্যে ঘোষণা করে যে, তার প্রশাসন গৃহযুদ্ধ করবে না। আটটি অঙ্গরাজ্য ইউনিয়ন বর্জনের এই ঘোষণাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করে। অন্যদিকে কনফেডারেট বাহিনী কনফেডারেসির অধীন অসংখ্য দুর্গ দখল করে। এরই মধ্যে উভয়পক্ষ একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান করার চেষ্টা করলে ও তা সম্ভব হয় না এবং উভয়পক্ষে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে। কনফেডারেটরা ভেবেছিলো তারা ইউরোপে কটন রপ্তানি বন্ধ করে দিলে ইউরোপিয়ান শক্তিগুলো যুদ্ধে তাদের পক্ষে হস্তক্ষেপ করবে। এই কূটনীতির নাম হলো “ কিং কটন ডিপ্লোমেসি”। তবে তাদের সেই আশা পূরণ আর হয়নি, কেউই তাদের স্বীকৃতি প্রদান করেনি। মূল সহিংসতা শুরু, Emancipation Procalamation ও বিজয় ১৮৬১ সালের ১২ই এপ্রিল কনফডারেটরা ইউনিয়নের ( উত্তরের রাজ্যগুলো সহ কনফেডারেসির বাইরে অন্যান্য রাজ্য) গুরুত্বপূর্ণ দূর্গ ফোর্ট সামটারের উপর হামলা করলে শুরু হয় মূল সহিংসতা। ১৮৬২ সালে “Emancipation Proclamation “ এর মাধ্যমে লিংকন ১৮৬৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কনফেডারেসির অন্তর্ভুক্ত সকল রাজ্যের দাসদের মুক্ত ঘোষণা করেন৷ এর ফলে কনফেডারেসির অধীন রাজ্যগুলো থেকে কৃষাঙ্গ দাসরা পালিয়ে গিয়ে ইউনিয়নের হয়ে যুদ্ধে যোগ দেয়৷ এতে একদিকে কনফেডারেসিতে শ্রমিকের অভাব দেখা দেয়, অন্যদিকে ইউনিয়নের যোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যেই ১৮৬৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে আব্রাহাম লিঙ্কন পুনরায় ক্ষমতায় আসেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৬৫ সালের এপ্রিল মাসের ৯ তারিখে কনফেডারেটসদের সেনাপতি রবার্ট লি ইউনিয়নের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং শেষ হয় রক্তক্ষয়ী এই গৃহযুদ্ধ৷ যুক্তরাষ্ট্রের এই গৃহযুদ্ধে ইউনিয়নের ১,১০,০০০ সৈনিকসহ কনফেডারেটদের ৯৩,০০০ সৈনিক নিহত হয়, এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।আর বিনিময়ে ১৮৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসে আমেরিকা দাসপ্রথাকে অবৈধ ঘোষণা করে সংবিধানের ১৩ তম সংশোধনী আনে। বিলুপ্ত হয় দাসপ্রথার মতো ঘৃণ্য প্রথা। আব্রাহাম লিংকনকে হত্যা তবে যুদ্ধ শেষের আনন্দের ৬ দিন পরেই এপ্রিলের ১৫ তারিখে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন মহান নেতা আব্রাহাম লিঙ্কন। বর্বোরচিত দাসপ্রথা বন্ধে এই নেতার অবদান অবর্ণনীয়। শেষটা হোক তাঁর বিখ্যাত গেটিসবার্গ স্পিচের একটা ছোট অংশ নিয়ে “government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth.”